
নিশ্চয়তা সম্বন্ধে যে ৫টি বিষয় আপনার জানা উচিত রবার্ট এম. গডফ্রে
23-10-2026
যীশুর কি একটি প্রকৃতি না দুইটি?
06-11-2026৩ ধরণের আইন [বিধানবাদ] বা নিয়মসর্বস্বতা/আইনসর্বস্বতা
একজন খ্রীষ্টিয়ান হিসেবে আপনি কি কখনও আইনসর্বস্বতার জন্য অভিযুক্ত হয়েছেন? খ্রীষ্টিয় উপসংস্কৃতিতে এই শব্দটি প্রায়ই যত্রতত্র ভুলভাবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, কিছু কিছু লোক যোহনকে একজন আইনসর্বস্ব ব্যক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করতে পারে কারণ তারা তাকে সংকীর্ণমনা বলে মনে করেন। কিন্তু আইনসর্বস্বতা বলতে এই শব্দটি সংকীর্ণমনাকে বোঝায় না। বাস্তবে, আইন বা নিয়মসর্বস্বতা অনেক সূক্ষ্ম উপায়ে নিজেকে প্রকাশ করে।
মূলত, আইনসর্বস্বতা হলো ঈশ্বরের ব্যবস্থাকে তার মূল প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখাকে বোঝায়। কিছু মানুষ খ্রীষ্টিয় জীবনে নিয়ম-কানুন মেনে চলার বিষয়টিতেই যেন মগ্ন থাকেন; তারা খ্রীষ্টধর্মকে কেবল ‘কী করা উচিত আর কী করা উচিত নয়’-এমন সব বিধিনিষেধ এবং প্রাণহীন ও কঠোর নৈতিক নীতিমালার সমষ্টি হিসেবে মনে করেন। এটি এক ধরণের আইনসর্বস্বতা, যেখানে একমাত্র ব্যক্তি ঈশ্বরের আইন বা ব্যবস্থা পালন করাকেই চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হিসেবে গন্য করা হয়।
এখন, ঈশ্বর অবশ্যই চান যেন আমরা তার আদেশগুলো পালন করি। তবুও এর সঙ্গে আরও অনেক কিছু আছে যা আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয়। ঈশ্বর দশ আজ্ঞার মতো ব্যবস্থা দিয়েছিলেন একটি চুক্তির প্রেক্ষাপটে। প্রথমত, ঈশ্বর ছিলেন অনুগ্রহশীল। তিনি মিশরের দাসত্ব থেকে তাঁর লোকদের মুক্ত করেনছিলেন] এবং ইস্রায়েলের সঙ্গে একটি প্রেমময়ী, পিতৃসুলভ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। এই অনুগ্রহভিত্তিক সম্পর্ক স্থাপিত হওয়ার পরই কেবলমাত্র ঈশ্বর তাঁর কাছে গ্রহনযোগ্য সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থাগুলো সংজ্ঞায়িত বা জানাতে আরম্ভ করেছিলেন। গ্র্যাজুয়েট স্কুলে আমার একজন প্রফেসর ছিলেন যিনি বলেছেন, “খ্রীষ্টিয় ঈশ্বতত্ত্বের মুল ভিত্তি হলো অনুগ্রহ, এবং খ্রীষ্টিয় নৈতিকতার মূল ভিত্তি হলো কৃতজ্ঞতা।” আইনসর্বস্ব ব্যক্তি বা আইনবাদী ব্যবস্থাকে ঈশ্বর, যিনি ব্যবস্থা দিয়েছেন তাঁর কাছ থেকেই বিচ্ছিন্ন করেন। তিনি ঈশ্বরের বাধ্য হওয়া বা খ্রীষ্টকে সম্মান করার চেয়ে এমন কিছু নিয়মকানুন পালন করতেই বেশি মনোযোগী, যেগুলোর সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের কোনো অস্তিত্ব নেই।
সেখানে কোন প্রেম, আনন্দ, জীবন বা আকাংখা থাকে না। এটি অভ্যাসবশত, যান্ত্রিকভাবে নিয়মকানুন পালন করার একটি পদ্ধতি যাকে আমরা বাহ্যিকতাবাদ বলি। যারা কঠোরভাবে আইন পালনে বিশ্বাসী, তারা কেবল আইনের আক্ষরিক নিয়মকানুন মেনে চলার ওপরই মনোযোগী হয়ে ঈশ্বরের প্রেম ও মুক্তির সেই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটকে উপেক্ষা করেন, যার মধ্যে ঈশ্বর প্রথমে তাঁর ব্যবস্থা দিয়েছিলেন ।
বিধানবাদ বা আইনসর্বস্বতার দ্বিতীয় ধরনটি বুঝতে হলে আমাদেরকে মনে রাখতে হবে যে, নূতন নিয়ম ব্যবস্থার অক্ষর এর বাহ্যিক রূপ এবং ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্যের মধ্যে পার্থক্য করে। আইনসর্বস্বতার দ্বিতীয় ধরনটি আইনের আক্ষরিক রূপকে ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। এতে ব্যবস্থার আক্ষরিক নির্দেশ পালিত হলেও মূল উদ্দেশ্যটি লঙ্ঘিত হয়। পূর্বে উল্লেখিত আইনসর্বস্বতার সাথে এই দ্বিতীয় ধরণের আইনসর্বস্বতার মধ্যে শুধুমাত্র খুবই সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে।
একজন ব্যবস্থার আক্ষরিক নিয়মকানুন পালন করেও কিভাবে এর মুল উদ্দেশ্যকে লঙ্ঘন করতে পারেন? ধরা যাক, একজন ব্যক্তি রাস্তার পরিবেশ পরিস্থিতি যাই হউক না কেন তিনি নির্ধারিত সর্বনিম্ন গতিতেই তার গাড়ী চালাতে পছন্দ করেন। তিনি যদি কোন আন্তঃরাজ্য মহাসড়কে গাড়ী চালান এবং যেখানে সর্বনিম্ন গতিসীমা প্রতি ঘন্টায় ৪০ মাইল নির্ধারিত হয়ে থাকে, সেখানে তিনি প্রতি ঘন্টায় ৪০ মাইল গতিতেই গাড়ী চালাবেন এর চেয়ে কম গতিতে নয়। এমনকি মুষলধারে বৃষ্টির সময়ও তিনি এমনটা করেন, অথচ তখন এই নির্ধারিত সর্বনিম্ন গতিতে গাড়ী চালানো আসলে অন্যদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। কারণ অন্যরা তখন বিচক্ষনতার সঙ্গে গতি কমিয়ে ঘন্টায় ২০ মাইল গতিতে গাড়ী চালান, যেন গাড়ী পিছলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তা থেকে ছিটকে না পড়ে যায় বা পানির ওপর দিয়ে ভেসে না যায়। এমন পরিস্থিতিতেও যিনি ঘন্টায় চল্লিশ মাইল গতিতে গাড়ী চালানোর ব্যাপারে অনড় থাকেন, তিনি মূলত কেবল নিজেকে খুশি করার উদ্দেশ্যেই গাড়ী চালাচ্ছেন। বাইরে থেকে তাকে নাগরিক নিয়ম কানুন মেনে চলার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সচেতন মনে হলেও, তার আনুগত্য কেবল বাহ্যিক; আইনের প্রকৃত উদ্দেশ্য বা মর্মার্থের প্রতি বিন্দুমাত্র তিনি গুরুত্ব দেন না। আইনসর্বস্বতার এই দ্বিতীয় ধরনটি কেবলমাত্র বাহিক্য নিয়মকানুনই মেনে চলে, অথচ তার হৃদয় ঈশ্বরের প্রতি কিংবা তাঁর ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্যের প্রতি বা তাঁর খ্রীষ্টের প্রতি সম্মান করার কোনো আকাঙ্ক্ষা থাকে না।
আইনসর্বস্বতার এই দ্বিতীয় ধরনটি ফরীশীদের উদাহরণের মাধ্যমে বোঝানো যেতে পারে, যারা বিশ্রামবারে যীশু অসুস্থ ব্যক্তিকে সুস্থ করায় তাঁর বিরোধিতা করেছিল (মথি ১২:৯-১৪)। তারা কেবলমাত্র ব্যবস্থার আক্ষরিক দিকটির ক্ষেত্রেই বেশী মনোযোগী ছিল এবং তাদের দৃষ্টিতে কাজ বা শ্রম মনে হয় এমন সমস্ত কিছুকেই তারা এড়িয়ে চলতো। এই ধর্মীয় শিক্ষকরা ব্যবস্থার মুল উদ্দেশ্য বা মর্ম বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিল, বিশ্রামবারের এই ব্যবস্থাটি মূলত এমন সাধারণ শ্রমের বিরুদ্ধেই ছিল যা জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য নয় এবং এটি অসুস্থ ব্যক্তিকে সুস্থ করার প্রচেষ্টা বা এমন কাজের বিরুদ্ধে ছিল না।
আইনসর্বস্বতার তৃতীয় ধরনটি ঈশ্বরের ব্যবস্থার সাথে আমাদের নিজেদের নিয়মকানুন যুক্ত করে এবং সেগুলোকে ঐশ্বরিক হিসেবে মর্যাদা দেয়। এটিই সবচেয়ে প্রচলিত এবং আইনসর্বস্বতার মারাত্নক রূপ। যীশু ঠিক এই বিষয়টি নিয়েই ফরীশীদের ভর্ৎসনা করে বলেছিলেন, “তোমরা মানুষের তৈরী রীতনীতিকে ঈশ্বরের বাক্য হিসাবে শিক্ষা দাও।” যেখানে ঈশ্বর কোন বিধিনিষেধ আরোপ করেননি, সেখানে মানুষের ওপর বিধিনিষেধের বোঝা চাপানোর কোনো অধিকার আমাদের নেই।
প্রতিটি মণ্ডলীর নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে নিজস্ব নীতিমালা নির্ধারণ করার অধিকার রয়েছে। উদাহরহণস্বরুপ, মণ্ডলীর সহভাগীতার সমাবেশ স্থানে বা মিলন কক্ষে কোমল পানীয় সমন্ধে বাইবেলে কিছু বলা হয়নি, তবে এই সমস্ত বিষয়ে নিয়ন্ত্রণ করার পূর্ণ অধিকার মণ্ডলীরই রয়েছে। কিন্তু যখন আমরা মানুষের তৈরী এই নীতিমালাগুলোকে কারো বিবেকের ওপর চুড়ান্তভাবে চাপিয়ে দিই এবং সেগুলোকে কারো পরিত্রাণের নির্ণায়ক করে তুলি, তখন আমরা বিপজ্জনকভাবে এমন একটি বিষয়ে হস্তক্ষেপ করি, যার ওপর একমাত্র ঈশ্বরেরই কর্তৃত্ব রয়েছে।
অনেকেই মনে করেন যে, খ্রীষ্টধর্মের মূল বিষয় হলো সঠিক নিয়মকানুন মেনে চলা, এমনকি বাইবেলে উল্লেখ নেই এমন নিয়মকানুনও পালন করা। উদাহরণস্বরূপ, বাইবেল বলে না যে আমরা তাস খেলতে পারব না বা রাতের খাবারের সময় এক গ্লাস মদ খেতে পারব না। এই সব বিষয়গুলোকে দিয়ে আমরা প্রকৃত খ্রীষ্ট ধর্মকে বিচার করতে পারি না। এমন হলে তা হবে সুসমাচারের এক মারাত্নক লঙ্ঘন, কারণ এটি মানুষের তৈরী প্রথাকে আত্মার প্রকৃত ফলের বিকল্প স্থাপন করবে। এভাবে খ্রীষ্টকে ভুলভাবে তুলে ধরার মাধ্যমে আমরা বিপজ্জনকভাবে ঈশ্বরনিন্দার কাছাকাছি পৌঁছে যাই। ঈশ্বর যেখানে স্বাধীনতা দিয়েছেন, সেখানে মানুষর তৈরী নিয়মকানুনন দিয়ে মানুষকে কখনোই দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করা উচিত নয়। নিয়মসর্বস্বতার এই প্রবণতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে আমাদেরকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে।
সুসমাচার মানুষকে অনুতাপ করতে, পবিত্র হতে এবং ঈশ্বরভক্তি জীবনযাপন করতে আহবান করে। এ কারণেই জগত সুসমাচারকে অপরাধ বা আপত্তিকর বলে মনে করে। কিন্তু, ধিক আমাদের! যদি আমরা খ্রীষ্টধর্মের প্রকৃত সত্যকে বিধানবাদের সাথে মিশিয়ে বিবৃক করে সেই বিঘ্নের কারণকে আরও বাড়িয়ে তুলি। কারণ খ্রীষ্টধর্ম হলো নৈতিকতা, ধার্মিকতা, এবং নীতিবোধের সাথে সম্পর্কিত, আমরা সতর্ক না থাকলে খুব সহজেই ঈশ্বর সম্মত নৈতিকতার প্রতি গভীর আগ্রহ থেকে আইনসর্বস্বতার বা বিধানবাদের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারি।
এই প্রবন্ধটি মূলতঃ লিগনিয়্যার মিনিস্ট্রিজ ব্লগে প্রকাশিত হয়েছিল।


